অন্ধকার রাতের অভিশপ্ত জমিদারবাড়ি Part-2

শহর থেকে দূরে জঙ্গলের গভীরে ছিল অভিশপ্ত জমিদারবাড়ি। লোকমুখে প্রচলিত ছিল, যে এই বাড়ির কাছে যায়, সে আর জীবিত ফিরে আসে না। বাড়ির শেষ বাসিন্দা আত্রেয়ী রহস্যময়ভাবে মারা যাওয়ার পর থেকেই নাকি বাড়িটা অভিশপ্ত। গ্রামের বয়স্করা বলত, "ওই বাড়ি কারও আত্মা ছাড়ে না।" অর্ঘ্য, একজন দুঃসাহসী সাংবাদিক, এসব গল্প শুনে ঠিক করল সত্যিটা উদঘাটন করবে। এক ঝড়ো রাতে, সে ক্যামেরা আর টর্চ নিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াল। বাড়ির দিকে যাওয়ার পথ অন্ধকার আর নীরব। পা ফেললেই শুকনো পাতার মচমচ শব্দ, আর অদূর থেকে ভেসে আসা শেয়ালের ডাক যেন পরিবেশটা আরও ভীতিকর করে তুলছিল। বাড়ির দরজায় পৌঁছে সে একবার ফিরে তাকাল। চারপাশে কেউ নেই। সাহস করে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। দরজা বন্ধ হতে ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে কারো চাপা ফিসফিসানির শব্দ শুনল—“যেও না!” অর্ঘ্য থমকে গেল। পেছনে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। তার মনে হল এটা তার ভ্রম। কিন্তু বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই তার মনে হল চারপাশ যেন কোনো অদৃশ্য চোখে তাকে ঘিরে রেখেছে। ভেতরে বাতাস ছিল ভারী, মেঝেতে ধুলো জমে আছে, আর দেওয়ালজুড়ে মাকড়সার জাল। হঠাৎ করেই একটা ছবির ফ্রেম মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল। অর্ঘ্য টর্চের আলো ফেলতেই দেখল ফ্রেমে জমিদারের মেয়ে আত্রেয়ীর ছবি—সেই একই মেয়ের মুখ, যার গল্প সে শুনেছিল। তার ঠোঁটের কোণে ছিল এক অদ্ভুত হাসি। ছবিটার দিকে তাকাতেই হঠাৎ আত্রেয়ীর চোখ নড়ল। অর্ঘ্য আতঙ্কে পেছনে সরে গেল। তখনই চারপাশে একসঙ্গে কান্নার শব্দ শোনা যেতে শুরু করল। দেয়ালের ফাটল থেকে রক্তের মতো লাল তরল চুঁইয়ে নামতে লাগল। অর্ঘ্য অনুভব করল, মেঝের নীচ থেকে যেন কেউ ধাক্কা দিচ্ছে।
এগিয়ে যাওয়ার সাহস করল। বাড়ির ওপরের তলায় যাওয়ার সিঁড়ি ধরে উঠতেই দেখল, সিঁড়ির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে আত্রেয়ী। তার চোখের কালো গভীরতা যেন জীবনের সব আলোকে শুষে নিচ্ছে। “কেন এসেছ এখানে?”—একটা গলার আওয়াজ, যা একাধিক গলার সম্মিলিত সুরে শোনা যাচ্ছিল। অর্ঘ্য উত্তর দিতে পারল না। তার গলা শুকিয়ে গেছে। মেয়েটি এবার এগিয়ে এসে তার গলার কাছে মুখ নিয়ে বলল, “তুমি এসেছ মুক্তি দিতে। কিন্তু আগে তোমাকেই দিতে হবে।” হঠাৎ করেই বাড়ি কেঁপে উঠল। ঘরের প্রতিটি জানালা একসঙ্গে খুলে গেল, আর ভেতরে ঝড়ের মতো বাতাস ঢুকতে লাগল। বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য ছায়ামূর্তি ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগল। তার মধ্যে একটা ছায়া অর্ঘ্যের ঘাড়ে হাত রাখল। সেই স্পর্শ ছিল যেন বরফের চেয়েও ঠাণ্ডা। মেয়েটি এবার অর্ঘ্যের চোখে চোখ রেখে বলল, “তোমার আত্মা এবার আমার। আর তুমি এই বাড়ির নতুন বন্দি।” সেই মুহূর্তে মেঝে ফেটে গেল, আর অর্ঘ্য অন্ধকারে তলিয়ে গেল। সে অনুভব করল, তার শরীর থেকে কিছু একটা টেনে নেওয়া হচ্ছে। যখন তার চেতনা হারিয়ে গেল, তার শেষ দেখা দৃশ্য ছিল আত্রেয়ীর বিভৎস হাসি। পরদিন সকালে গ্রামবাসীরা অর্ঘ্যকে বাড়ির সামনে অজ্ঞান অবস্থায় পেল। তার মুখ দিয়ে ফেনা বেরোচ্ছিল। ক্যামেরায় শেষ তোলা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিল, একটা অন্ধকার ঘরে অসংখ্য ছায়ামূর্তি একসঙ্গে অর্ঘ্যকে ঘিরে আছে। বাড়িটার সামনে লেখা ছিল—“মুক্তি দিতে এলে, নিজের মুক্তি ফেলে যেয়ো।”
Next Post Previous Post