অন্ধকার রাতের অভিশপ্ত জমিদারবাড়ি
শহর থেকে দূরে জঙ্গলের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল পুরনো জমিদারবাড়ি। লোকমুখে প্রচলিত, বাড়িটা অভিশপ্ত। কেউ কেউ বলত, বাড়ির শেষ জমিদারের মেয়ে, আত্রেয়ী, এক রাতে নিজের ঘরে রহস্যময়ভাবে মারা গিয়েছিল। সেই থেকে বাড়িটায় নাকি তার আত্মা ঘুরে বেড়ায়।
অর্ঘ্য, একজন দুঃসাহসী সাংবাদিক, এই বাড়ির গল্প শুনে ঠিক করল যে, সত্যটা নিজেই খুঁজে বের করবে। এক ঝড়ো রাতে, টর্চ আর ক্যামেরা হাতে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। ঝড়ের হাওয়ায় বাড়ির ভাঙা জানালাগুলো এমন শব্দ করছিল যেন ভেতরে কিছু অপেক্ষা করছে।
দরজা ঠেলে সে ভিতরে ঢুকল। একবার ভেতরে ঢুকতেই, দরজাটা নিজের থেকেই জোরে বন্ধ হয়ে গেল। অর্ঘ্য ফিরে তাকিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করল, কিন্তু দরজা যেন পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। তার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল।
ঘরের ভেতর থেকে একটা চাপা শ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। দেওয়ালের গায়ে ছায়া পড়ছিল—কিন্তু কোথাও আলো ছিল না। অর্ঘ্য যখন টর্চের আলো ফেলল, দেখল ছায়াটা তারই দিকে এগিয়ে আসছে। ছায়াটা থামল, আর তার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে এক নারীমূর্তি বেরিয়ে এল।
মেয়েটি ছিল সাদা পোশাক পরে, তার চুল এলোমেলো, আর চোখ দুটো যেন গভীর কুয়োর মতো কালো।
“কেন এসেছ এখানে?”—একটা কর্কশ, কাঁচ ফাটার মতো আওয়াজ বেরোল মেয়েটির মুখ থেকে।
অর্ঘ্য ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমি… আমি শুধু সত্যটা জানতে চেয়েছিলাম!”
মেয়েটি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল। “সত্য? সত্য চাইতে হলে মূল্য দিতে হয়,” বলে হেসে উঠল। সেই হাসি ছিল এতটাই বিভৎস যে অর্ঘ্যের কান দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করল। মেয়েটি তার দিকে হাত বাড়াল।
হাতটা স্পর্শ করার আগেই, অর্ঘ্য অনুভব করল, মেয়েটির চারপাশ থেকে হিমশীতল বাতাস এসে তাকে যেন জড়িয়ে ধরছে। তার শরীর অসাড় হয়ে গেল। হঠাৎ ঘরের প্রতিটি কোণ থেকে একসঙ্গে অসংখ্য গলার আওয়াজ শোনা যেতে লাগল। "আমাদের মুক্তি দাও! মুক্তি দাও!"
অর্ঘ্য অনুভব করল, তার পা ভেঙে মাটিতে বসে পড়েছে। মেয়েটি এবার ফিসফিস করে বলল, "তুমি যখন এসেছ, তোমার আত্মাটাই আমার মুক্তির পথ।" এই বলে তার মুখ খুলল, আর ভিতর থেকে কালো ধোঁয়ার মতো কিছু বেরিয়ে এসে অর্ঘ্যকে ঢেকে দিল।
পরদিন সকালে, গ্রামবাসীরা বাড়ির সামনে অর্ঘ্যের দেহ দেখতে পেল। তার চোখদুটো ভয়ানকভাবে খোলা, আর তার ঠোঁটের কোণে রক্ত জমাট। তার ক্যামেরায় শেষ ছবিটা ছিল—একটি নারীর কালো চোখ, যে তাকিয়ে ছিল সরাসরি ক্যামেরার দিকে।
