দরজার পেছনে
রাত প্রায় ২টা। শহরের নির্জন অ্যাপার্টমেন্টে একা ছিল তনুশ্রী। এটা তার নতুন ফ্ল্যাটে প্রথম রাত। বাইরে গাছের পাতা ঝরার শব্দ, জানালার কাঁচে বাতাসের সোঁ-সোঁ আওয়াজ আর ফ্ল্যাটের ভেতরের গভীর নীরবতা একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করছিল। তনুশ্রী জানালার পাশে বসে কাজ করছিল, হঠাৎ রান্নাঘরের দিক থেকে একটা মৃদু শব্দ কানে এলো। যেন ধাতব কিছু মাটিতে পড়ার শব্দ। সে একটু চমকে উঠল। প্রথমে ভাবল, হয়তো জানালার পর্দা বাতাসে নড়েছে। কিন্তু মিনিট খানেক পর আবার শব্দ হলো। এবার পরিষ্কার বোঝা গেল, এটা যেন কারও আস্তে আস্তে হাঁটার আওয়াজ।
সে মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দরজাটা সামান্য খোলা ছিল, আলো জ্বলছিল। ভিতরে ঢুকেই চারপাশটা ভালো করে দেখল তনুশ্রী। কিছুই নেই। ঘর একেবারে ফাঁকা। হয়তো পুরোনো ফ্ল্যাট বলে কোথাও কোনো বস্তু পড়ে যাচ্ছিল। নিজের ভাবনাকে যুক্তি দিয়ে শান্ত করল। ঠিক তখনই, পেছন থেকে একটা ধাতব শব্দ হল।
তনুশ্রী চমকে ঘুরে দেখল, তার ফ্ল্যাটের প্রধান দরজাটা আস্তে আস্তে খুলছে। বাইরে কেউ নেই, কেবল অন্ধকার। সে দ্রুত দৌড়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। লকটা ভালোভাবে চেক করল। পুরো শরীর যেন ঘামে ভিজে গেল তার। ফ্ল্যাটে ফিরে এসে ফোনটা হাতে নিল, পুলিশের নম্বর ডায়াল করার জন্য। ঠিক তখনই ফোনটা নিজে থেকেই বেজে উঠল। স্ক্রিনে অচেনা নম্বর। তনুশ্রী দ্বিধায় পড়ল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ফোনটা ধরে বলল, “হ্যালো?” ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ঠান্ডা, শীতল একটা কণ্ঠ শোনা গেল, “তুই দরজাটা খোলা রেখেছিলি কেন?” তনুশ্রীর গলা শুকিয়ে এলো।
“কে কথা বলছেন?
আপনি কে?”
কণ্ঠটা কোনো উত্তর দিল না। ফোনের লাইন কেটে গেল।
তনুশ্রী ভয় আর অবাক হয়ে কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর নিজেকে শান্ত করতে ঘরের সব আলো জ্বালিয়ে দিল। মনে হলো আলো থাকলে হয়তো ভয়টা কমবে। কিন্তু তখনই সে বুঝল, ঘরের এক কোণে কোনো ছায়া দেখা যাচ্ছে। ছায়াটা তার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। তার চুলগুলো এলোমেলো, আর লম্বা শরীরটা বেঁকে আছে অদ্ভুত ভঙ্গিতে। তনুশ্রী দৃষ্টি সরাতে পারছিল না। ভয় পেয়ে দরজার দিকে দৌড়াতে গিয়েও থেমে গেল, কারণ ছায়াটা আস্তে আস্তে তার দিকে ঘুরে তাকাল। তার মুখে কোনো চোখ ছিল না। শুধু গভীর, কালো শূন্যতা।
“তুই চলে যেতে চাস? এখন কি খুব দেরি হয়ে গেল না?” ছায়াটা ফিসফিস করে বলল। তনুশ্রীর আর্তচিৎকারে ফ্ল্যাটের কাচের জানালা কেঁপে উঠল।
