হলুদিয়া কায়কোবাদ

 অপরাধের স্বীকারোক্তি: হলুদিয়া কায়কোবাদ

আমি একজন অপরাধী—ভয়ংকর অপরাধী। আজ আমি আপনার কাছে আমার সমস্ত অপরাধের কথা স্বীকার করতে এসেছি। দয়া করে আমার কথাগুলো ফাজলামি ভেবে উড়িয়ে দেবেন না। এখন যে অবস্থায় আমি পৌঁছেছি, তাতে সত্য বলার ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই।

আমার নাম কায়কোবাদ। আমি একজন সাধারণ কাঠমিস্ত্রি। তবে আমি সব কিছু বানাই না, কেবলমাত্র সোফা। কারণ সোফা আমার ভালোবাসা।
সোফা বানানোটা আমি এমনভাবে করি, যেন সে একটা জীবন্ত প্রাণ। আমার হাতের ছোঁয়ায় একেকটা সোফা হয় রাজকীয়, আরামদায়ক, স্বপ্নের মতো। সবাই চিনে আমাকে—"কায়কোবাদের সোফা" নামে।



যখন নতুন সোফা তৈরি হয়, আমি প্রথমে নিজে বসি। একদিকে দেখি সোফা, অন্যদিকে দেখি আমার চেহারা। সব সময়ই মনে হয়—আমার রুক্ষ চেহারাটা আমার বানানো সুন্দর সোফার সামনে হেরে যায়।

এই সোফা যায় বড়লোকদের বাড়িতে, দামি ড্রইংরুমে, স্নিগ্ধ আলোয়। আমি, কায়কোবাদ, কোনোদিন সেখানে যাব না—কারণ আমি গরিব।
তবে আমার সোফাগুলো যায়।

এতেই আমার রাগ জন্ম নেয়—জ্বলে ওঠে ঈর্ষা।
"সে সুন্দর মানুষের সংস্পর্শ পায়, আর আমি না?
সে রাজপ্রাসাদে যায়, আর আমি পড়ে থাকি নিজের টিনের ঘরে?"

একদিন, এক ভয়ঙ্কর ভাবনা মাথায় আসে।
"আমি যদি সোফার অংশ হয়ে যাই? আমি যদি সেই আরামের গায়ে লুকিয়ে থাকি?"

আমি তৈরি করলাম এক বিশেষ গোপন চেম্বার। সোফার ভেতরে এমনভাবে গোপন কুঠুরি বানালাম, যাতে একজন মানুষ ভিতরে বসে থাকতে পারে—কেউ টেরও পাবে না। সূক্ষ্ম এক ছিদ্র দিয়ে বাইরের আলো দেখা যায়, শ্বাস নেওয়া যায়, শব্দ শোনা যায়।

আমার উদ্দেশ্য ছিল দুই দিনের জন্য ওই অভিজাত পরিবেশ উপভোগ করে ফিরে আসা। অথবা কিছু দামী জিনিস চুরি করে একটা দিনমজুরের জীবন থেকে মুক্তি পাওয়া।

আমি প্রবেশ করলাম সেই গোপন চেম্বারে।
অভিযান শুরু হলো—“অপারেশন সোফার ভেতরে কায়কোবাদ”

প্রথমেই গেলাম এক বড় ব্যবসায়ীর বাসায়। তার স্ত্রী সোফার গায়ে হাত বুলাচ্ছিলেন…
আমার মনে হচ্ছিল, আমাকেই ছুঁয়ে যাচ্ছে কেউ। আমি কখনও এমন অনুভব করিনি।

এরপর এটা আমার নেশা হয়ে দাঁড়াল।
সোফার ভেতর লুকিয়ে মেয়েদের বাসায় যেতাম, তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত দেখতাম, চুরি করতাম।
মেয়েদের উপস্থিতি আমাকে এক ধরণের ঘোরে ফেলত।

তবে একদিন, সব ওলটপালট হয়ে গেল।

একটা মেয়ের বাসায় গিয়েছিলাম। সে নিজে তার ঘরের জন্য সোফাটা কিনেছিল।
দুই একদিনের পর্যবেক্ষণ আর চুরি করেই চলে যাওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু আমি তার প্রেমে পড়ে গেলাম।

তার ছোঁয়া, তার হাসি, তার আলতো হাত—সবকিছু সোফার গায়ে যেন আমার শরীরে আছড়ে পড়তো। আমি মুগ্ধ হয়ে থাকতাম, নড়তাম না। আমি জানতাম, এটা পাগলামি। কিন্তু আমি আর বের হতে পারিনি।

গত এক মাস আমি সেই মেয়েটির বাসায়ই আছি।
আমি তার খাবার খাচ্ছি, তার গন্ধে ঘুমাচ্ছি, তাকে অনুভব করছি।

আর আজ…
আমি আপনাকে এই চিঠি লিখছি, কারণ আপনি সেই মেয়ে।

হ্যাঁ, আপনি
আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
আপনার ডাকের অপেক্ষায় আছি।

ইতি,
হলুদিয়া কায়কোবাদ
(আপনার সোফার ভিতর থেকে লিখিত)


Next Post Previous Post