অভিশপ্ত বাড়ি

 রাত তখন প্রায় দুটো। ঘন কালো মেঘে ঢেকে গেছে আকাশ, মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু দূরে কোথাও শেয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে। গ্রামের শেষ প্রান্তে এক পুরনো জমিদারবাড়ি, বহু বছর ধরে পড়ে আছে পরিত্যক্ত। মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়, সেখানে কেউ গেলে আর ফিরে আসে না।
শহর থেকে আসা অর্ণব কিছুদিনের জন্য এই গ্রামে এসেছে। ভূতের গল্পে তার কোনো বিশ্বাস নেই। 

গ্রামবাসীরা তাকে সাবধান করেছিল,


— “ওই বাড়ির দিকে যেও না বাবু!
কত লোক গেছে, ফিরে আসেনি! যাদের পাওয়া গেছে, তারা পাগলের মতো প্রলাপ বকেছে। কেউ কিছু বোঝাতে পারেনি।”



অর্ণব হেসে বলেছিল, “এসব কুসংস্কার! ভূত বলে কিছু নেই। আমি নিজেই দেখে আসব।”
সেদিন রাতেই টর্চ হাতে সে রওনা দিল জমিদারবাড়ির দিকে। বাড়ির সামনে এসে থমকে গেল সে। বিশাল, ভাঙাচোরা দরজা যেন অনেকদিন খোলেনি। কুলুঙ্গিতে একজোড়া শূন্য চোখ যেন তাকিয়ে আছে তার দিকে। বাতাস থেমে গেছে, পাতা নড়ছে না, অথচ যেন কিসের একটা ভারী উপস্থিতি টের পাচ্ছে অর্ণব।


সে দরজাটা ধাক্কা দিতেই গুমগুম শব্দে খুলে গেল। ভেতরে প্রবেশ করতেই মনে হলো, এখানে কেউ একটা দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বাতাসে ভেসে এল পচা গন্ধ, যেন বহুদিনের অচেনা মৃত্যু বাসা বেঁধেছে এখানে।


হঠাৎ পেছন থেকে এল এক চাপা ফিসফিস আওয়াজ, যেন কেউ খুব কাছে থেকে বলছে, “ফিরে যাও...”
অর্ণব ঘুরে তাকাল, কিন্তু কেউ নেই। তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল, বুকের মধ্যে ধুকধুক করতে লাগল। সে পা বাড়াতেই পায়ের নিচে কিসের একটা নরম জিনিস পিষে গেল। টর্চের আলো ফেলতেই দেখল – একটা কাটা হাত! রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে, তবু মনে হচ্ছে, সেটা নড়ছে!


হঠাৎ দোতলা থেকে ভেসে এল করুণ চিৎকার। একটা মহিলার কণ্ঠস্বর – যেন দুঃসহ যন্ত্রণায় কাঁদছে। অর্ণবের শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল। সে উপরে তাকাতেই দেখল, ছাদের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে একটা ছায়ামূর্তি। শাড়ি পরা, লম্বা চুল মুখ ঢেকে রেখেছে, কিন্তু তার গলার কাছে কাটা দাগ স্পষ্ট!


হঠাৎ সেই ছায়া নিচের দিকে ঝাঁপ দিল, যেন উড়ে আসছে তার দিকে! অর্ণব দৌড় দিল দরজার দিকে, কিন্তু দরজাটা আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে গেল! সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করল, কিন্তু বাইরে থেকে কেউ শুনতে পেল না।


শেষবার যখন অর্ণবকে দেখা গিয়েছিল, সে ছিল ওই বাড়ির ভেতরে। পরদিন সকালে গ্রামবাসীরা সেখানে গিয়ে দেখল – দরজা বন্ধ, কিন্তু মেঝেতে লেখা রক্তের অক্ষরে – “আমি ফিরে এসেছি...”

Next Post Previous Post