অরণ্যের প্রেতাত্মা
রাতে গভীর জঙ্গল পেরোনোর জন্য রুদ্র একদমই প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু তার পক্ষে আর কোনো উপায় ছিল না। শহরের অন্যপাশে তার বোনের বিয়ে। বাস ছাড়তে দেরি হয়ে গিয়েছিল, তাই শর্টকাট নিতে সে পুরোনো "কালীবন" জঙ্গলের রাস্তা ধরেছিল। এই জঙ্গল ঘিরে বহু কাহিনী শোনা যায়—অদ্ভুত মৃত্যু, মানুষ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, আরেকটা রহস্যময় শক্তির উপস্থিতি। কিন্তু রুদ্র এসব কুসংস্কারে বিশ্বাসী ছিল না।
চাঁদের আলো ম্লান হয়ে আসছে। কালীবনের ভেতর ঢুকতেই রুদ্র অনুভব করল যে সবকিছু খুব অস্বাভাবিক। চারপাশে নিস্তব্ধতা, যেন প্রকৃতির শব্দগুলোও ভয় পেয়ে চুপ হয়ে গেছে। পায়ের নিচে শুকনো পাতার মচমচ শব্দ ছাড়া অন্য কিছু শোনা যাচ্ছিল না।
জঙ্গলের গভীরে যেতেই তার মনে হলো কেউ একজন তাকে অনুসরণ করছে। সে পেছন ফিরে তাকাল, কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। আবার হাঁটতে শুরু করল। কিছু দূর যেতে, তার কানে হালকা হাসির শব্দ এল। গলা শুকিয়ে গেল রুদ্রের। সে বুঝতে পারল, এটা কোনো সাধারণ হাসি নয়। সেই হাসির সুরে এক অদ্ভুত হিমশীতল অনুভূতি ছিল, যা সরাসরি তার হৃদয়ে গিয়ে লাগল।
সে দ্রুত হাঁটা শুরু করল। কিন্তু এবার আরও পরিষ্কারভাবে পায়ের শব্দ শোনা গেল, যেন কেউ ঠিক তার পেছনে পা মেলাচ্ছে। রুদ্র ভয় পেয়ে পেছন ফিরে বলল, "কে আছো? সামনে এসো!"
কোনো উত্তর এল না। চারপাশে শুধু অন্ধকার আর গাছপালার অস্পষ্ট ছায়া। হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে এক মহিলা বেরিয়ে এল। সাদা শাড়ি পরা, মাথা নিচু, লম্বা খোলা চুল। রুদ্র বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
"কে আপনি? এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?"
মহিলা ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল। তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল, এবং ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত হাসি। রুদ্রের গা হিম হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, এই মহিলা কোনো সাধারণ মানুষ নয়।
রুদ্র পেছনে ঘুরে দৌড় শুরু করল। তার পায়ের তলা থেকে মাটি যেন সরে যাচ্ছে। কিন্তু মহিলাটি হঠাৎ করে তার সামনে এসে উপস্থিত হলো। এবার তার মুখ একেবারে বিকৃত—চোখ থেকে রক্ত ঝরছে, দাঁতগুলো ধারালো আর তার গলায় ঝুলছে অদ্ভুত কিছু কঙ্কালের মালা।
"তুমি এই জঙ্গলে কেন ঢুকেছ?" মহিলাটি হিমশীতল গলায় বলল।
রুদ্র কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলল। তার মনে হলো, এই মুহূর্তে তার জীবন এখানেই শেষ।
---
এদিকে রুদ্রের বাড়িতে তার মা চিন্তিত। অনেক রাতে সে বাড়ি ফিরল না দেখে, তার বড় ভাই বিকাশ পুলিশকে খবর দিল। স্থানীয় কিছু লোকজন মশাল হাতে নিয়ে কালীবনের দিকে খোঁজ করতে বেরোল।
কিন্তু জঙ্গলে ঢুকে তারা রুদ্রের কোনো চিহ্ন পেল না। একটা পুরোনো ভাঙা মন্দিরের কাছে তারা শুধু রুদ্রের জুতো আর একটা সাদা শাড়ি পেল। তবে জঙ্গলের ভেতর থেকে একটা অস্পষ্ট কান্নার আওয়াজ আসছিল।
---
পরের দিন সকালে, রুদ্রকে পাওয়া গেল জঙ্গলের ঠিক মাঝখানে। কিন্তু সে সম্পূর্ণভাবে বদলে গিয়েছিল। তার শরীর শীতল, ঠোঁটে রক্ত জমাট বাঁধা। চোখ দুটো ফাঁকা। সে কোনো কথা বলছিল না, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল।
গাঁয়ের পুরোহিত জানালেন, এই কালীবনের ভেতরে বহু বছর আগে একটি মেয়ে আত্মহত্যা করেছিল। মেয়েটি গ্রামের প্রভাবশালী জমিদারের হাতে প্রতারণার শিকার হয়েছিল। তার মৃত্যুর পর থেকে তার আত্মা এই জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়, প্রতিশোধ নেয়ার জন্য।
রুদ্রকে গ্রামের মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে পূজা-অর্চনা করার পর জানা গেল, প্রেতাত্মা তাকে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু তার মনে কিছু স্মৃতি থেকে গেছে।
এক বছর পর রুদ্র পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলেও, সে কালীবনের কাছাকাছি আর কখনো যায়নি।
---
এই গল্পটি প্রমাণ করে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে কখনো কখনো ভয়ঙ্কর রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে। সেসব রহস্যকে সম্মান করে, জ্ঞান আর সাহসের সংমিশ্রণে এগিয়ে চলাই আমাদের দায়িত্ব।
