ভাওয়াল জঙ্গলের রাত: এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা⛔
সন্ধ্যার সময়টায় ভাওয়াল জঙ্গল যেন অন্য এক পৃথিবী। চারপাশের ঘন গাছপালায় ঢাকা, অন্ধকারে ডুবে থাকা এই জঙ্গল সবসময়ই এক রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করে। আমি—আরিফ, এবং আমার তিন বন্ধু শাওন, তমাল, ও রাহাত, ঠিক করলাম গাজীপুরের ভাওয়াল জঙ্গলে সন্ধ্যায় ঘুরতে যাব। আমাদের ধারণা ছিল, এটা নিছক একটা অ্যাডভেঞ্চার হবে। কেউ জানত না, এই নিরীহ পরিকল্পনাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতায় পরিণত হবে।
জঙ্গলের প্রবেশপথে পৌঁছাতেই এক বৃদ্ধ লোক আমাদের পথ আটকাল। তার পরনে ময়লা লুঙ্গি, মুখে পাতার জর্দায় রঙিন দাঁত, আর চোখে গভীর আতঙ্ক। তিনি বললেন, "সন্ধ্যার পর এ জঙ্গলে যেও না বাবা। যা দেখবা, তা ভুলতে পারবা না।"
আমি হেসে বললাম, "চাচা, আমরা কি ভূতপ্রেতে ভয় পাই নাকি? আমরা শহরের মানুষ, এসব গল্প আমাদের জন্য নয়।"
লোকটি আমাদের দিকে বিষন্নভাবে তাকিয়ে বলল, "যাও বাবা, যা হওয়ার হবে। কিন্তু সাবধান!"
জঙ্গলে ঢোকার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা বেশ আনন্দে কেটেছিল। পাখির ডাক, বাতাসে গাছের পাতার মৃদু সোঁ সোঁ শব্দ, আর আমাদের হাসি—সবই চলছিল। তবে জঙ্গল যত গভীরে প্রবেশ করছিলাম, চারপাশটা যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে উঠছিল। বাতাস থেমে গেল, পাখিদের ডাক শোনা বন্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ করেই আমাদের নাকে এলো এক ধরনের তীব্র গন্ধ—মৃত্তিকা আর পোড়া মাংসের মিশ্র গন্ধ।
তমাল হঠাৎ থেমে গিয়ে বলল, "শোনো! কিছু কি কাঁদার মতো আওয়াজ আসছে?"
আমরা সবাই থেমে কান পেতে শুনলাম। সত্যিই, গাছের মধ্যে থেকে আসছে নারীকণ্ঠের মৃদু কান্নার শব্দ। প্রথমে সেটা দূর থেকে ভেসে আসছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে যেন শব্দটা আমাদের আরও কাছে চলে এল।
শাওন বলল, "চলো, ফিরে যাই। আর দেরি না করাই ভালো।" কিন্তু আমরা তখন বুঝতে পারলাম, পথ হারিয়ে ফেলেছি। গাছগুলো এত ঘন ছিল যে, আমরা আর বুঝতে পারছিলাম না কোন দিক দিয়ে এসেছি।
ঠিক তখনই দূরে এক সাদা পোশাক পরা নারীর অবয়ব দেখতে পেলাম। গাছের ছায়ার আড়াল থেকে সে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখ যেন লাল আগুনের মতো জ্বলছিল। আমাদের সবার বুকের মধ্যে ধুকপুক শুরু হয়ে গেল।
রাহাত সাহস করে চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করল, "আপনি কে? এখানে কী করছেন?"
কোনো উত্তর নেই। নারীটি ধীরে ধীরে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তার চলার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল, সে যেন মাটির ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে না, বরং ভেসে আসছে। আমরা জমে গেলাম; কারও দৌড়ানোর সাহস হলো না। যখন সে আমাদের একেবারে কাছে এসে দাঁড়াল, তখন দেখলাম তার মুখ—অর্ধেক পুড়ে গেছে, আর বাকি অংশে যেন কোনো মাংস নেই, কেবল হাড়।
আমরা সবাই আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলাম। তখনি নারীটি এক ঝটকায় উধাও হয়ে গেল। তার জায়গায় পড়ে রইল শুকনো পাতার একটি ঢিবি। কিন্তু এর পরপরই চারপাশ থেকে ভেসে এল একাধিক কণ্ঠস্বর। কেউ অশ্রুভেজা কণ্ঠে কাঁদছে, কেউ আবার বিকৃত হাসিতে গাছ কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
আমাদের দৌড় শুরু হলো। তবে যতই দৌড়াই, মনে হচ্ছিল আমরা একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছি। হঠাৎ আমরা দেখতে পেলাম এক গাছের গুঁড়িতে আমাদের নাম খোদাই করা! "আরিফ, শাওন, তমাল, রাহাত"—সবগুলো নাম সেখানে খোদাই করা। আমরা স্তব্ধ। কিভাবে সম্ভব? আমরা তো এখানে কখনো আসিনি!
তখনই শাওন মাটিতে পড়ে গেল। তার হাত ধরে তোলার চেষ্টা করলাম। তার মুখে আতঙ্ক, সে বলল, "ওরা আমাদের ছাড়বে না।" তার কথা শুনে আমরা আরও আতঙ্কিত হয়ে গেলাম। কাকডাকা ভোরে কোনোভাবে জঙ্গলের এক প্রান্ত থেকে আলোর ঝলকানি দেখতে পেলাম। সেদিকে দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা জঙ্গলের বাইরে বের হয়ে এলাম।
বের হওয়ার পর পেছনে তাকানোর সাহস কারও ছিল না। আমরা গাড়িতে উঠে দ্রুত সেখান থেকে পালালাম। সেই রাতের কথা মনে পড়লে এখনো গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। বৃদ্ধ লোকের কথাটা মনে পড়ে বারবার—"যা দেখবা, তা ভুলতে পারবা না।"
এখনো কেউ জিজ্ঞেস করলে বলি, সন্ধ্যার পর কখনো ভাওয়াল জঙ্গলে যেও না। কারণ, সেখানে কিছু একটা আছে। কে বা কী, তা জানি না। তবে এটুকু জানি, সেটা মানুষ নয়।
🚫সমাপ্ত🚫
