ভূতুড়ে কুয়ো

গ্রামের ঠিক বাইরে ছিল এক পুরনো কুয়ো। গ্রামবাসীরা বলত, সেই কুয়োর পানি অভিশপ্ত। কেউ একবার সেই পানি ছুঁলেই নাকি কুয়োর গভীর থেকে ভেসে আসা এক রহস্যময় শক্তি তাকে টেনে নিয়ে যায়। বহু বছর আগে, গ্রামের জমিদারের স্ত্রী সেই কুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। তারপর থেকেই কুয়োর আশেপাশে অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করে। রাহুল আর তার বন্ধুরা এই গল্প শুনে কৌতূহলী হয়ে উঠল। তারা ঠিক করল কুয়োটার ভেতরে কী আছে তা খুঁজে বের করবে। এক অন্ধকার চাঁদহীন রাতে, তারা লণ্ঠন আর দড়ি নিয়ে কুয়োর কাছে এল। কুয়োর চারপাশে ছিল গভীর নীরবতা। ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজও যেন থেমে গেছে। কুয়োর পাড়ে পৌঁছেই রাহুলের মনে হল, কোথাও থেকে একটা শীতল বাতাস তাকে ছুঁয়ে গেল। দড়ি বেঁধে সে কুয়োর ভেতরে নামার প্রস্তুতি নিল। “তুমি নিশ্চিত তো, নেমে যাবে?” এক বন্ধু জিজ্ঞেস করল। রাহুল মুচকি হেসে বলল, “ভয়ের কিছু নেই। আমি তাড়াতাড়ি ফিরে আসব।”
সে কুয়োর ভেতরে নামতে শুরু করল। কয়েক ফুট নামার পরই চারপাশের অন্ধকার এতটাই ঘন হয়ে গেল যে লণ্ঠনের আলোও ফিকে লাগছিল। কুয়োর দেয়ালে শ্যাওলা আর পানির ছাপ ছিল, আর মাঝে মাঝে অদ্ভুত একধরনের কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। হঠাৎই রাহুলের মনে হল, কুয়োর গভীর থেকে কেউ তার নাম ধরে ডাকছে। “রাহুল... রাহুল...” সে লণ্ঠন উঁচু করে নীচে তাকাল। নীচে কেবল অন্ধকার। তারপর... যেন হঠাৎই কেউ তার দড়ি ধরে টানতে শুরু করল। এতটাই জোরে টান যে রাহুল প্রায় হাত ফসকে পড়ে যাচ্ছিল। কুয়োর গভীর থেকে ভেসে আসা ফিসফিসানির আওয়াজ আরও জোরালো হল। “আমাকে মুক্তি দাও... আমার প্রতিশোধ চাই...!” রাহুল আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না। তখনই তার লণ্ঠনের আলোয় দেখল, কুয়োর দেয়ালের সাথে লেগে আছে একটা বিকৃত মুখ। মুখটা ছিল এক নারীর, তার চোখ গর্তের মতো ফাঁকা, আর ঠোঁট থেকে রক্ত ঝরছিল। “তুমি এখানে এসেছ, আমার জগতে। এখন পালানোর কোনো পথ নেই,” নারীমুখটা ফিসফিস করে বলল। উপরে থাকা বন্ধুরা রাহুলকে টেনে তুলতে চেষ্টা করল। কিন্তু দড়ি যেন আরও ভারী হয়ে গিয়েছিল। যখন বন্ধুরা টানতে টানতে রাহুলকে উঠিয়ে আনল, তারা দেখল রাহুলের মুখ ফ্যাকাসে, চোখ দুটি ফাঁকা আর ঠোঁটে শুকনো রক্তের দাগ। রাহুল কেবল একবার বলল, “সে আসছে… সবাইকে নিয়ে যাবে…” পরদিন সকালে গ্রামের মানুষজন কুয়োর কাছে রাহুলের মৃতদেহ পেল। তার মুখে ছিল বিভৎস এক হাসি। কুয়োর পানির ওপর ভেসে ছিল এক নারীর প্রতিবিম্ব, যে স্থির চোখে তাকিয়ে ছিল। সেই থেকে কুয়ো আরও অভিশপ্ত হয়ে গেল। রাত হলে কুয়োর পাশ দিয়ে যাওয়া মানুষদের ভেসে আসত নারীর হাসি আর রক্তহীম করা ফিসফিসানি—“আমার প্রতিশোধ শেষ হয়নি.
Next Post Previous Post