রক্তঝরা দরজা

গভীর জঙ্গলের মধ্যে এক রহস্যময় বাড়ি ছিল। গ্রামের মানুষ বলত, সেই বাড়ির ভেতরে যারা একবার ঢোকে, তারা আর ফিরে আসে না। বাড়ির দরজায় লাল রঙে লেখা ছিল, **“প্রবেশ নিষেধ।”** কেউ জানত না, রঙটা সত্যিই লাল রং, নাকি শুকিয়ে যাওয়া রক্ত। তিনজন দুঃসাহসী তরুণ—অজিত, বিনায়ক, আর সঞ্জয়—তাদের কৌতূহল মেটাতে সেই বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সন্ধ্যার ঠিক পরে তারা লণ্ঠন হাতে জঙ্গলের দিকে রওনা দিল। বাড়িটা ধীরে ধীরে তাদের সামনে ফুটে উঠল—ভাঙাচোরা দেয়াল, জংধরা জানালা, আর সেই ভয়ংকর দরজা। তারা দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। মেঝেতে পায়ের নীচে কাঠের চিৎকারের মতো শব্দ হচ্ছিল। ভেতরে ঢুকে তারা দেখতে পেল দেয়ালে মানুষের হাতের ছাপ, যেন কেউ রক্তমাখা হাতে দেওয়াল আঁকড়ে ধরেছিল। হঠাৎ একটা দরজা থেকে সোঁ সোঁ করে হাওয়া বেরোল। মনে হলো কেউ সশব্দে শ্বাস নিচ্ছে। বিনায়ক বলল, **“চলো, ভেতরে দেখি। হয়তো কোনো গোপন কক্ষে কিছু পাওয়া যাবে।”** তারা দরজা ঠেলে ঢুকল। ঘরটা ঠান্ডা, যেন বরফ জমে আছে। হঠাৎ ঘরের কোণ থেকে একটা মেয়ের করুণ কণ্ঠ শোনা গেল, **“আমাকে সাহায্য করো!”** তারা ভয়ে জমে গেল। সেখানে মেয়েটাকে দেখতে পেল—ফিকে সাদা পোশাকে, তার চুল এলোমেলো, আর চোখ থেকে রক্ত ঝরছে। অজিত সাহস করে জিজ্ঞেস করল, **“তুমি কে?”**
মেয়েটি হঠাৎ তাদের দিকে ঘুরল। তার মুখটা বিকৃত হয়ে এক অমানবিক রূপ নিল। তার গলা থেকে গর্জনের মতো আওয়াজ বেরোল, **“তোমরা পালানোর চেষ্টা করো না। এখানেই তোমাদের শেষ!”** তারা দরজার দিকে দৌড়াল, কিন্তু দরজাগুলো নিজের থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। অজিত লণ্ঠন উঁচু করে দেখল, দেওয়ালে নতুন লেখা—**“তোমাদের সময় শেষ।”** তারা বুঝতে পারল, তারা ফাঁদে পড়েছে। হঠাৎ অজিত আর সঞ্জয় দেখল, বিনায়ক কোথাও নেই। চারদিকে তাকিয়ে তারা খুঁজতে লাগল, কিন্তু বিনায়কের চিৎকার ভেসে এল উপরের তলা থেকে। তারা দৌড়ে উপরে উঠল। তারা যা দেখল, তাতে তাদের গা শিউরে উঠল। বিনায়কের দেহটা ছাদের এক কোণে পড়ে ছিল, তার চোখ দুটো ফাঁকা আর গলায় গভীর কাটা দাগ। দেয়ালে লেখা ছিল, **“একজন চলে গেছে, আরও দুজন বাকি।”** অজিত আর সঞ্জয় আর দেরি না করে পালানোর চেষ্টা করল। দরজার কাছে এসে দেখে, দরজার সামনে এক ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে। মেয়েটি এবার তাদের দিকে এগিয়ে আসছে, আর তার চোখ থেকে আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছে। তারা আর পালাতে পারল না। পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা বাড়ির সামনে অজিত আর সঞ্জয়ের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখল। দুজনের চোখ ফাঁকা, আর শরীরের রক্ত শুকিয়ে গেছে। বাড়িটার দরজা আজও লাল রঙে ঢাকা। এবং লেখা আছে সেই একই বার্তা—**“প্রবেশ নিষেধ।”**
Next Post Previous Post